বিশ্বব্যাপী এইচআইভি ভাইরাসে
আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত সাড়ে তিন কোটির বেশি মানুষ মারা গেছে বলে জানাচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য
সংস্থা। শুধুমাত্র ২০১৯ সালে মারা গেছে প্রায় সাত লাখ মানুষ। বিশ্বব্যাপী আরও তিন কোটি
সত্তর লাখ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত রয়েছেন। প্রতি বছর আরও নতুন করে ১৮ লাখের মত মানুষ
এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন। এইচআইভি ভাইরাস থেকেই শুধুমাত্র আপনি এইডস আক্রান্ত হবেন।
এটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য বিষয়ক সংকটগুলোর একটি। ১৯৮০ সালে প্রথম
এই ভাইরাসটি ছড়াতে শুরু করেছে বলে জানা যায়।
এইডস
সম্পর্কে ৭ টি ভুল ধারণাঃ
১.
আক্রান্তদের সাথে সাধারণ মেলামেশাঃ ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যের জনসংখ্যার
২০ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করতো এইচআইভি আক্রান্ত ব্যাক্তিকে স্পর্শ করলে আপনিও আক্রান্ত
হবেন। কিন্তু এটি কোন ছোয়াচে রোগ নয়। একই বাতাসে নিঃশ্বাস নিলে, হাত মেলালে, জড়িয়ে
ধরলে, চুমু খেলে, একই পাত্রে খাবার খেলে, পানি খেলে, আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত ব্যক্তিগত
সামগ্রী ব্যবহার করলে, তার ব্যবহৃত টয়লেট ব্যবহার করলেও এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত হবেন
না।
২.
নিরাময় সম্পর্কে প্রচলিত কিছু মিথঃ আফ্রিকার কিছু দেশ, ভারত ও
থাইল্যান্ডের অনেকের বিশ্বাস আক্রান্ত হওয়ার পর কুমারী মেয়ে বা যৌন সম্পর্কের কোন
অভিজ্ঞতা নেই এমন কারোর সাথে যৌন মিলনে এই ভাইরাস দূর হয়ে যায়। কিন্তু এটি একেবারেই
ভুল ধারণা। এত বরং কুমারীরা আক্রান্ত হয়। এই অঞ্চলে এই বিশ্বাসের কারণে কুমারীদের ধর্ষণের
ঘটনা ঘটেছে। ১৬শ শতকে ইউরোপে সিফিলিস ও গনোরিো আক্রান্ত হলে একই ধরনের বিশ্বাস প্রচলিত
ছিল। তবে সেক্ষেত্রেও কুমারীদের সাথে যৌন মিলন কার্যকর নয়।
৩.
মশা দ্বারা কি এটি ছড়ায়ঃ মশা একই ঘরে থাকা মানুষজনকে কামড়াতে থাকে।
আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ে যদি অন্য ব্যক্তিকে কামড়ায় তাহলেও এটি ছড়াতে পারে সেটিও ভুল
ধারণা। যৌন মিলনের পর স্নান করলে এইচআইভি ভাইরাস পরিষ্কার হয় এই ধারণাও একেবারেই ভুল।
যদিও রক্ত দ্বারা এই ভাইরাস ছড়ায় কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে মশা বা রক্ত খায় এমন কিট
দ্বারা আপনি আক্রান্ত হবেন না। একটি হল একজনের শরীর থেকে রক্ত খেয়ে সে সেই রক্ত দ্বিতীয়
কোন ব্যক্তির শরীরে ইনজেকশন দেওয়ার মতো করে রক্ত ঢুকিয়ে দেয় না। আর মশা বা অন্য কিটের
শরীরে এই জীবাণু খুব সামান্য সময় বেচে থাকে।
৪.
ওরাল সেক্সে কি এটি হতে পারেঃ আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে ওরাল
সেক্স অপেক্ষাকৃত কম ঝুকিপূর্ণ। তবে এইচআইভি পজিটিভ নারী বা পুরুষের সাথে ওরাল সেক্সের
মাধ্যমে আক্রান্ত হওয়া সম্ভব। কিন্তু এর হার খুব বিরল।
৫.
কনডমেও রয়েছে ঝুকিঃ কনডম ব্যবহার করলে এইচআইভি আক্রান্ত হওয়ার কোনই
আশঙ্কা নেই। এমন ধারণা ঠিক নয়। কারণ আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে যৌন মিলনের সময়ে কনডম ফুটো
হয়ে গেলে আপনি বিপদে পড়তে পারেন। ইদানীং প্রচারণায় শুধু কনডম ব্যবহারে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে
তা নয়। নিয়মিত রক্ত পরীক্ষার ব্যপারেও উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। আক্রান্ত প্রতি চারজন ব্যক্তির
অন্তত একজন সে যে আক্রান্ত তা নিজেই জানেন না। সে হয়ত নিজের অজান্তে অন্যজনকে আক্রান্ত
করছে।
৬.
কোন লক্ষণ না থাকলে কী ঘটেঃ কোন লক্ষণ দেখা না দিলে এইচআইভি আক্রান্ত
নন এটিও ভুল ধারণা। এই জীবাণুতে আক্রান্ত হওয়ার পরও একজন ব্যক্তির শরীরে দীর্ঘ দিন
কোন রকমের লক্ষণ দেখা নাও দিতে পারে। এভাবে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১০-১৫ বছরও বেচে
থাকতে পারে। এই ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার পর শুরুর কয়েকটি সপ্তাহের মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জার
ভাব দেখা দিতে পারে, হালকা জ্বর, মাথা ব্যাথা, গলাব্যাথা ও শরীরে র্যাশ দেখা দিতে
পার। অন্যান্য লক্ষণগুলো দেখা দিবে যখন ধীরে ধীরে তখন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে
যাবে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করাই এইচআইভির মূল বিপদ।
৭.
এইচআইভিতে আক্রান্তরা অল্প বয়সে মারা যায়ঃ ইদানীং নানা ধরনের চিকিৎসার
জন্য এইচআইভি পজিটিভ ব্যাক্তিও দীর্ঘদিন সুস্থ্য জীবন যাপন করতে পারছেন। জাতিসংঘের
এইচআইভি সংক্রান্ত সংস্থা বলছেন, আক্রান্তদের মধ্যে ৪৭ শতাংশের ক্ষেত্রে এইচআইভি জীবাণুর মাত্রা নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রয়েছে। এমনকি
অনেক সময় রক্ত পরীক্ষায়ও জীবাণুটি ধরা পড়ে না। তবে তারা যদি চিকিৎসায় অবহেলা করেন তবে
এর মাত্রা আবার শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। জীবাণু নিয়ন্ত্রিত থাকলে আক্রান্ত মা তার
শিশুকে আক্রান্ত নাও করতে পারেন। মায়েরা সবসময় শিশুদের আক্রান্ত করেনা।
প্রচলিত ধারণা হচ্ছে আক্রান্ত নারী সন্তান জন্ম দিলে তার শিশুরও শরীরে এই জীবাণু চলে যাবে। কিন্তু সবসময় সেটি নাও হতে পারে। আক্রান্ত মায়ের শরীরের জীবাণুর মাত্রা যদি নিয়ন্ত্রণে থাকে তবে সন্তান জন্মদানের সময় সে শিশুকে আক্রান্ত নাও করতে পারে।

0 Comments